আলোচিত নিউজ

ব্যাংকে প্রচুর অর্থ আছে; কিন্তু সেটা যদি উদ্যোক্তারা না পান, তাহলে তো সমস্যা

ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর। শিক্ষকতা করেছেন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে। নতুন মুদ্রানীতি, প্রণোদনা প্যাকেজে ঋণের ব্যবহার নিয়ে সাম্প্রতিক দেশকালের সঙ্গে কথা বলেছেন এই অর্থনীতিবিদ।

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন খন্দকার মুনতাসীর মামুন কেমন হলো নতুন মুদ্রানীতি? এবারের মুদ্রানীতি গতবারের মতোই করা হয়েছে। পলিসি রেট চেঞ্জ হয়নি। সামান্য এদিক-ওদিক হয়েছে। এটা আসলে বিশেষ পরিস্থিতির জন্যই করা। অর্থাৎ কোভিড উত্তরণের

চেষ্টা। তবে গতবারের অভিজ্ঞতা পর্যালোচনা করে এটা যথাযথ হয়েছে, এমন বলার উপায় নেই। বর্তমান অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে এবারের মুদ্রা নীতি আরও বাস্তবভিত্তিক, গতিশীল এবং প্রো-একটিভ হওয়া উচিত ছিল ব্যাংক খাতে তারল্যের পরিমাণ অনেক। অন্যদিকে কোভিড মোকাবেলা এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সরকারেরও

অর্থের চাহিদা রয়েছে। এক্ষেত্রে আর্থিক ব্যবস্থাপনায় কোন বিষয়ে বিশেষ মনোযোগ দেওয়া দরকার? ব্যাংকের তারল্যের বিষয়ে মুদ্রানীতিতে কিছুই বলা হয়নি। এ বিষয়ে মুদ্রানীতি একেবারেই নীরব। এবারের মুদ্রানীতি সংকুলানমুখী। আগে তো সিআরআর, এসএলআর কমিয়ে দিয়ে ব্যাংকের অর্থায়ন এবং তারল্য বাড়ানো হয়েছিল। এবার এখানে কোনো পরিবর্তন আসেনি। সিআরআর বা

এসএলআর বাড়ানো হয়নি। makeup করার কোনো চেষ্টা হয়নি। এখন বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, রিভার্স রেপো (বিপরীত পুনঃক্রয়চুক্তি) করে অতিরিক্ত টাকা উঠিয়ে নেবে; কিন্তু এটা তো একটি এডহক সিদ্ধান্ত। আগেই ব্যাংকগুলোকে বলা উচিত ছিল যে, তোমাদের ১০০ টাকা আছে, সেখানে ৯০ টাকা ঋণ দিতে হবে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে অর্থায়ন খুব জরুরি ছিল। সেটা হয়নি। এবার বন্ড অপশনে গেলেন। সেটা তো সরকার

নেবে। ঠিক আছে। সরকারের অর্থের দরকার আছে; কিন্তু ব্যাংকাররা অতি বুদ্ধিমান। ডিপোজিট রেট যখন ২/৩ থাকে, তখন তারা ভাবে ৫-৬ টাকা আমরা বসে বসেই আয় করব। তাই তারা বন্ডের অপশনকে গুরুত্ব দেয়। বন্ডে গেলে হয়তো সরকারি অর্থায়ন হয়; কিন্তু তাতে তো প্রাইভেট সেক্টর লাভবান হচ্ছে না। ডিপোজিটররা লাভবান হচ্ছেন না। শিল্প লাভবান হচ্ছে না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের উচিত ছিল, সরকারের যে ডেফিসিট হয়েছে, সেটা পূরণে কোনো স্থানীয় সঞ্চয় থেকে সহায়তা নেওয়া।

সরকারের ঘাটতি পূরণে অনেক ব্যবস্থা আছে। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন অনেক লাভজনক প্রতিষ্ঠান আছে, যেখান থেকে টাকা নেওয়া যায়। তাদের অনেক প্রকল্প আছে। অনেক অর্থ ব্যাংকে এফডিআর করে রাখা আছে। বরং অর্থ মন্ত্রণালয়ের এটাই দেখা উচিত ছিল যে, এত টাকা ব্যাংকে রাখা হয়েছে কেন? ওখান থেকেই একটি বড় অর্থায়নের সুযোগ থাকে। অর্থাৎ সার্বিকভাবেই আমাদের আর্থিক ব্যবস্থাপনা দুর্বল। এর সবটা মুদ্রানীতি ঠিক করতে পারবে না। এ দায়িত্ব সরকারের বাজেট ব্যবস্থাপনা এবং ফিসক্যাল

ম্যানেজমেন্টের ওপরও বর্তায়। বিদায়ী অর্থবছরের বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি মাত্র ৮.৫ শতাংশ। যেখানে মুদ্রানীতিতে টার্গেট ছিল ১৪.৮ শতাংশ। এক্ষেত্রে ঋণ দিতে ব্যাংকগুলোর অনীহা না-কি চাহিদাই কম ছিল? ঋণের প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর উপায় কী? ব্যাংকগুলো গতানুগতিকভাবে তাদের দায়িত্ব পালন করলে এবারও ঋণ প্রবৃদ্ধি কাক্সিক্ষত মাত্রায় পৌঁছাবে না। ব্যাংকগুলো যদি মনে করে যে, যারা ঋণ নেয় তাদের অবস্থা দেখব, তাদের সম্পদ দেখব, তাদের জামানত দেখব, শুধু প্রফিট দেখব, কীভাবে অর্থ আদায় করা যায় সেটা দেখব- এই যে বাধা ধরা নিয়ম,

এ থেকে যদি বেরিয়ে আসা না যায়, তাহলে ঋণ প্রবৃদ্ধি বাড়বে না। হ্যাঁ, একভাবে বাড়ানো যায় হয়তো। তারা বড় বড় সেক্টর, উদ্যোক্তাদের ঋণ দিতে পারে; কিন্তু সেটা দেওয়া কোনোভাবেই ঠিক হবে না। কারণ ঋণ এমনিতেই কেন্দ্রীভূত হয়ে গেছে। বড় বড় শিল্প খাতে আরও ঋণ দিলে সে ক্ষেত্রে নানারকম সমস্যা দেখা দিতে পারে। কাজেই বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে ব্যাংকগুলোকে নির্দেশনা দেওয়া উচিত যে, তোমরা ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের ঋণ দাও। করোনাকালে এরা সমস্যার মধ্যে আছে। অর্থের অভাবে অনেক শিল্প কারখানা, দোকানপাট বন্ধ হয়ে গেছে। অনেকে নিঃস্ব হয়ে গেছেন। সেখানেই ঋণ সহায়তা বেশি দরকার। এটা মনে

রাখতে হবে যে, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পেই বেশি কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হয়। বড় বড় ইন্ডাস্ট্রিতে ১০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেও ১০০ জনের বেশি নিয়োগ দেওয়া যায় না। অথচ ছোট ও মাঝারি শিল্পে ১ কোটি টাকা ৫০০টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ভাগ করে দিতে পারবে। এতে সেই প্রতিষ্ঠানের ৫০০০ কর্মী উপকৃত হতে পারে, তাদের প্রতিষ্ঠান টিকে যেতে পারে, তারা কাজ চালিয়ে যেতে পারে। অর্থাৎ ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের মধ্যেই বেশি ঋণ বিতরণ করা দরকার। কৃষি, মৎস্যচাষ, পশুপালন, হাঁস-মুরগি পালন, হর্টিকালচার ও আরবরিকালচারে ঋণ দিতেই হবে। এসব খাতে যদি ঋণ দেওয়া না যায়, তাহলে ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য অর্জিত হবে না এবং এসব অর্থায়ন কোনোভাবেই আমাদের উন্নয়নের সহায়ক হবে না। প্রণোদনার ঋণের একটি অংশ শেয়ারবাজার ও অনুৎপাদনশীল খাতে যাচ্ছে বলে বাংলাদেশ ব্যাংক জানতে পেরেছে।

এ ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভূমিকা কী হওয়া উচিত? প্রথমত, এটা ব্যাংকিং খাতের দুর্বল ব্যবস্থাপনা। তারা প্রণোদনার অর্থ দিয়েছে বড় বড় সেক্টরে। তারা সেটা যথাযথভাবে ব্যবহার করছে কি-না সেটা দেখভালের দায়িত্ব ছিল ব্যাংকগুলোর। যারা ৫ কোটি টাকা চেয়েছে তাদের আসলেই ৫ কোটি টাকা লাগবে কি-না, সেটা যাচাই করে দেখা হয়নি। হয়তো দরকার ছিল ৩ কোটি। পেয়েছে ৫ কোটি। অতিরিক্ত ২ কোটি তারা অন্য খাতে সরিয়ে নিচ্ছে। এসবই হয়েছে। অনেকে তো গাড়ি-বাড়ি কিনেছে, শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ করেছে। এটা অবশ্যই ব্যাংকের দোষ। এ ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উচিত ছিল, ব্যাংকের কার্যক্রম যথাযথভাবে মনিটরিং করা। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিশাল কর্মীবাহিনী আছে, অফসাইড মনিটরিং আছে, অনসাইড মনিটরিং আছে। স্পেশাল অডিট সেকশন আছে। এরা নিয়মিত কেন মনিটরিং করেনি? এক একটি ব্যাংকে দুই-তিন মাস পর পর একটি মনিটরিং

টিম গেলেই তো সবকিছু জানা যায়। সেটা কেন করা হয়নি। এখন যা হয়েছে, যেভাবেই হোক, সেটা সামাল দিতে হবে। প্রণোদনার অর্থ শেয়ারবাজারে গেছে কি-না তা খতিয়ে দেখতে হবে। এ ক্ষেত্রে অনিয়ম প্রমাণিত হলে, যারা এসব করেছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। করোনায় অনেকে চাকরি হারিয়েছেন। যারা নতুন করে চাকরির বাজারে প্রবেশ করছেন তারাও চাকরি পাচ্ছেন না। এতে যে ভারসাম্যহীনতার সৃষ্টি হচ্ছে, তা মোকাবেলায় করণীয় কী? আমি আগেই বলেছি, এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ক্ষুদ্র, মাঝারি এবং স্ব-উদ্যোক্তাদের জন্য অর্থায়নের বিষয়টি নিশ্চিত করা। শুধু চাকরি না, আত্মকর্মসংস্থানের জন্যও অনেকে চেষ্টা করছেন, তাদের দক্ষতা, সৃজনশীলতা এবং উদ্যম আছে; কিন্তু অর্থের অভাবে এগোতে পারছেন না। এ ক্ষেত্রে ব্যাংক কী করে? তারা ভাবে, ঝুঁকি নেবো কি নেবো না, খোঁজ নেয়

ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জামানতের অর্থ আছে কি-না। এসব করলে তো হবে না। বরং ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারাই কম ঝুঁকিপূর্ণ। আপনি দশজন ছোট উদ্যোক্তাকে দশ লাখ করে ঋণ দিলেন। তাতে মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়াল এক কোটি। সেখানে হয়তো দু-একজন খেলাপি হতে পারে। অন্যদিকে বড় উদ্যোক্তাকে দিলেন বিশ কোটি। সে যদি খেলাপি হয়, তাহলে তো সব গেল। ব্যাংকারদের এসব বোঝা উচিত। তাছাড়া এখন অনেক রকম ফাইনান্সিয়াল টেকনোলজি আছে, সিকিউরিটাইজেশন আছে, সমস্যা তো নেই। কারও যদি সম্পদ না থাকে, ব্যালেন্সশিট না থাকে; কিন্তু ব্যবসায় ডেইলি রিটার্ন ভালো, আউট লুক ভালো, তাকে তো ঋণ দেওয়া উচিত। ব্যাংকগুলোকে এসব বিষয়ে মনোযোগ দিতে হবে। সৃজনশীল উদ্যোগে বিনিয়োগ করতে হবে। আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টিতে বাংলাদেশ ব্যাংককে এগিয়ে আসতে হবে। ব্যাংকে প্রচুর অর্থ আছে; কিন্তু সেটা যদি উদ্যোক্তারা সময়মতো না পান, তাহলে তো সমস্যা। ধরুন, গুদামে অনেক খাবার

আছে; কিন্তু ক্রেতার কেনার সামর্থ্য নেই। পরিবহনে অসুবিধা, আড়তদারদের যোগসাজশে খাবার বাজারে আসছে না। বাজারে এলেও ক্রয়ক্ষমতা নেই। অতএব, খাদ্য থাকলেই হবে না। সেটা ভোক্তার ঘরে পৌঁছাচ্ছে কি-না তা নিশ্চিত করতে হবে। তেমনিভাবে ব্যাংকে টাকা থাকলেই হবে না। সে টাকার সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা জরুরি। সঠিক সময়ে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা যেন ঋণ পান, সে ব্যাপারে খেয়াল রাখতে হবে। এ ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতাগুলো দূর করতে হবে।
মুদ্রানীতি বাস্তবায়নে আপনার পরামর্শ কী?
মুদ্রানীতির ক্ষেত্রে যেসব লক্ষ্য দেওয়া হয়েছে, সেটা অনেকটা কম্পাসের মতো। এটা দিক-নির্দেশনা দেবে; কিন্তু মুদ্রানীতি যথার্থভাবে বাস্তবায়ন করতে হলে বাংলাদেশ ব্যাংককে সুশাসনের দিকটি স্পষ্ট করতে হবে। ব্যাংকগুলোই মূল কাজ করবে, তবে তাদের তদারকির বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংককে জোরালো ভূমিকা পালন করতে হবে ব্যাংক খাতে অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতি দূর করতে হবে সবার আগে। কারণ আপনি নীতি দিলেন; কিন্তু এসব বাস্তবায়ন করবে তো ব্যাংক। পিলার যদি দুর্বল থাকে, তবে ঘরটা ঠিকভাবে তৈরি করবেন কীভাবে। এই যে ব্যাংক, ফিন্যান্সিয়াল ইনস্টিটিউশন, এরাই তো স্টেকহোল্ডার। এদের ছাড়া কীভাবে মুদ্রানীতি বাস্তবায়ন করবেন, বলুন। কাজেই বাংলাদেশ ব্যাংককে আরও তৎপর হতে হবে, আরও শক্ত হতে হবে এবং মুদ্রানীতি বাস্তবায়নে দ্রুত দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিতে হবে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
Close