আলোচিত নিউজ

শেষ পর্যন্ত জানা গেল, কেন পদ্মা সেতুতে বারবার ফেরির ধাক্কা

বাংলাদেশের মানুষের স্বপ্নের বস্তু ছিল পদ্মা সেতু। আর এই সেতু নিয়ে হয়েছে নানা ধরনের সব কর্মকান্ড। শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়ন হয়েছে সেই সেতুর স্বপ্ন। তবে বর্ষা মৌসুমে উত্তাল পদ্মা পাড়ি দিতে গিয়ে গত ৪৫ দিনে ছয়বার

পদ্মা সেতুতে ফেরির ধাক্কার ঘটনায় শিমুলিয়া-বাংলাবাজার নৌরুটে চলাচলকারী ফেরিগুলোর কারিগরি ত্রুটির দিকটি সামনে এসেছে আবার। প্রশ্ন উঠেছে, তীব্র স্রোতের বিপরীতে ফেরি পরিচালনায় চালকদের দক্ষতা নিয়েও
এই রুটে চলাচলকারী ১৭টি রো-রো ও কে-টাইপ ফেরির

চালকদের দক্ষতা, স্রোতের বিপরীতে ফেরির নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতার দিকটি নিয়ে এখন বিষদ পর্যালোচনার প্রয়োজন বলে মনে করছেন পদ্মা সেতু কর্তৃপক্ষ, অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন করপোরেশন (বিআইডব্লিউটিসি) ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা।
পদ্মা সেতু কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, চার হাজার টনের জাহাজের ধাক্কা সহ্যের ক্ষমতা রয়েছে পদ্মা সেতুর। ১০ হাজার টনের ‘ফ্রিকশন

পেন্ডুলাম বিয়ারিং’ থাকায় রিখটার স্কেলে ৯ মাত্রার ভূমিকম্প বা সমমানের কম্পন সহ্য ক্ষমতা রয়েছে। ফলে ৬০০ থেকে হাজার টনের ফেরির ধাক্কায় সেতুর ক্ষতির শঙ্কা কম। ফেরির ধাক্কার ঘটনার পর মাদারীপুরের বাংলাবাজার থেকে ঘাট সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে শরীয়তপুরের জাজিরায়। তবুও প্রশ্ন উঠেছে, ফেরি চলাচলের জন্য বিকল্প রুট বেছে নিতে এত সময় লাগছে কেন।

চার দিনের ব্যবধানে শুক্রবার সকাল পৌনে সাতটার দিকে সেতুর ১০ নম্বর পিলারে ধাক্কা খায় কে-টাইপের ফেরি ‘কাকলি’। গত বুধবার ‘বীরশ্রেষ্ঠ জাহাঙ্গীর নামে একটি ফেরি ধাক্কা খায় ১১ নম্বর পিলারে। গত ২৩ জুলাই ‘শাহজালাল’ ফেরি ধাক্কা খেয়েছিল ১৭ নম্বর পিলারে। ২ থেকেই ২০ জুলাইয়ের মধ্যে আরো তিনটি ধাক্কার ঘটনা ঘটেছিল। অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন করপোরেশনের

(বিআইডব্লিওউটিসি) কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শিমুলিয়া-বাংলাবাজার নৌরুটে চলাচল করা ১৭টি ফেরির ১৫টিই মেয়াদোত্তীর্ণ। এগুলোর গতি নদীতে বর্তমান স্রোতের গতির চেয়ে কম। ফলে ফেরি যখন সেতুর নিচ দিয়ে বাংলাবাজার থেকে শিমুলিয়ার দিকে আসে তখন স্রোতের পিলারে ধাক্কা খাচ্ছে।
তারা জানান, তীব্র স্রোতের কারণে শুক্রবার ১৭টি ফেরির ১৩টি চলাচল বন্ধ ছিল। চারটি কে-টাইপ ফেরি চলাচল করে।

স্রোতের কারণে সেগুলোর নদী পারাপারে স্বাভাবিকের দ্বিগুণ সময় লাগছে।
শিমুলিয়া ঘাটের ব্যবস্থাপক শাফায়েত আহমদ জানিয়েছেন, গত ৪৫ দিনে ছয়টি ধাক্কার ঘটনার প্রতিটি ঘটেছে, ফেরি বাংলাবাজার থেকে শিমুলিয়ায় আসার পথে অর্থাৎ স্রোতের অনুকূলে চলার সময়। স্রোতের প্রতিকূলে চলে সেতুর নিচ দিয়ে যাওয়ার সময় পিলার ধাক্কার একটি ঘটনাও ঘটেনি। এ বিষয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের একজন কর্মকর্তা বলেন, শুক্রবার মাওয়া পয়েন্টে পানির

গভীরতা ছিল পাঁচ দশমিক ৩৮ মিটার, যা ২০১৩ সালের পর সর্বোচ্চ। পানি বাড়ায় এ বছর নদী আগের তুলনায় খরস্রোতা। সে কারণেই একের পর ফেরি ধাক্কা খাচ্ছে সেতুর পিলারে। স্রোতের কারণে জরাজীর্ণ ফেরি চালানো ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। পদ্মাসেতুর প্রকল্প পরিচালক মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, কয়েক দশকের পুরনো ফেরির দুর্বল ইঞ্জিনগুলোর গতি বর্ষা মৌসুমে পদ্মা নদীর তীব্র স্রোতের চেয়ে কম বা কাছাকাছি। সেতুর পিলার নির্মাণে নদীতে পানি প্রবাহের পথ সংকুচিত হয়ে স্রোতের গতি আরও

বেড়েছে। নদীর তলদেশ থেকে পানির উপরে থাকা পিলারের ক্যাপ বা ভিত ষড়ভূজ আকৃতির। এ আকৃতির কারণে সেগুলোকে কেটে স্রোত চলে যায়। ক্ষতি করতে পারে না। তবে এই আকৃতির কারণেই পিলারের দিকে পানির তোড় বেশি থাকে, ঘূর্ণন সৃষ্টি হয়। ফলে দুর্বল ইঞ্জিনের ফেরিগুলো স্রোতের টানে পিলারের দিকে গিয়ে ধাক্কা খাচ্ছে। আবার চালকদেরও দক্ষতার অভাব রয়েছে।
তিনি জানান, ফেরির ধাক্কায় পদ্মা সেতুর ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা কম। বিআইডব্লিউটিসি সূত্র জানিয়েছে, নদীতে চলতি বর্ষায় কারেন্ট (স্রোত) সেকেন্ডে দুই থেকে তিন মিটার। অর্থাৎ ঘন্টায়

স্রোতের গতি সাত কিলোমিটারের বেশি। এ রুটে যেসব ফেরি চলে সেগুলোর সর্বোচ্চ গতি ১০ দশমিক ২ কিলোমিটার। ভাটির দিকে আসার সময়, স্রোত ও নৌযানের গতি মিলিয়ে তা দাঁড়ায় ঘণ্টায় ১৭ কিলোমিটার। এ গতি নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা নেই ফেরির। ফলে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পিলারে ধাক্কা মারে। এ দিকে এ নিয়ে বেশ বিপাকে পড়েছে মন্ত্রনলায়ও। কয়েক দিনের ব্যবধানে কেন হচ্ছে এমন তা নিয়ে উৎকন্ঠায় যাচ্ছে তাদের সময়। শেষ বার ধাক্কা দেয়া কাকলি ফেরির মাস্টার মো. বাদল হোসেন বলেন, পদ্মা সেতুর ১১ ও ১২ পিলারের মধ্য চলার কথা ছিল তার। কিন্তু

নদীর প্রচণ্ড স্রোত ও বাতাসের কারণে ভেসে গিয়ে ১০ নম্বর পিলারে ধাক্কা খান। এতে ফেরির একপাশে ফাটল ধরে। তবে পিলারের কোনো ক্ষতি হয়নি।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
Close