অন্যান্য

ঘানি টেনে চলছে মা-মেয়ের জীবনযুদ্ধ!

দেশী সরিষা পেশাই করে তেল বের করা যন্ত্রকে ঘানি, বা ঘানি গাছ বলা হয়। সাধারণত ঘানি টানার জন্য কলুরা গরু ব্যবহার করে। তবে দরিদ্র কমলা বেগমের গরু কেনার সামর্থ নেই। অভাবের সংসার। একদিন ঘানি

না ঘুরালে সংসারের চাকা ঘুরে না। অভাব যখন ঘরের দরজায় উঁকি দেয়, চারদিক তখন অন্ধকার হয়ে আসে পরিবারটির। কখনো স্বামী-স্ত্রী, কখনো মা-মেয়ে কাঠের তৈরি কাতলার উপর প্রায় ৪০০ কেজি ওজন বসিয়ে ঘাড়ে জোয়াল নিয়ে ঘানি টানছেন

প্রায় ৩২ বছর ধরে। ঘানির টানে ডালার ভিতরে সরিষা পেশাই হয়ে পাতলানী দিয়ে ফুঁটা ফুঁটা তেল পড়ে ঘটিতে। বাজারে বা গ্রামে সেই তেল বিক্রি করতে পারলেই সংসার চলে তাঁদের। ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলার কুশমাইল কড়ইতলা গ্রামে তারা মিয়ার স্ত্রী কমলা বেগম। তাঁদের দুই ছেলে ও এক কন্যা

সন্তান রয়েছে। দুই সন্তান বিয়ে করে আলাদা হয়ে গেছে। জমি জমা নেই। ভিটেবাড়ি টুকুই সম্বল। মানুষকে নির্ভেজাল তেল খাওয়াবেন বলে বংশপরম্পরায় এ পেশা তাঁরা এখনও ছাড়ছেন না। তাঁদের বংশের সবাই এ পেশা ছেড়ে দিয়েছেন। গ্রামের মানুষ এ পেশা ছেড়ে দিতে বলেন এবং মাঝে মধ্যেই কটূকথাও বলেন। সবকিছু সহ্য করে বাপ-দাদার পেশা আগলে ধরে রেখেছেন।

মেশিনের তৈরি সরিষার তেলের দাম বাজারে কম। ঘানি ভাঙ্গা তেলের দাম বেশি। সাধারণ মানুষ বেশি দামে ঘানির তেল কিনতে চায় না। যারা ভেজালমুক্ত ঘানি ভাঙ্গা খাঁটি সরিষার তেল কিনেন,সংখ্যায় তাঁরা একেবারেই কম।
ফুলবাড়িয়ায় কড়ইতলা ও পানেরভিটা দুই গ্রামে এক সময় অনন্ত দুই শতাধিক পরিবারের ঘানি গাছ ছিল। কালের বির্বতনে আর

ইঞ্জিল চালিত যান্ত্রিক চাকার কারনে ঘানি শিল্প এখন প্রায় বিলুপ্তের পথে। কুশমাইল কড়ইতলা গ্রামে দুটি বাড়িতে এখন মাত্র তিনটি ঘানি গাছ রয়েছে। শমসের আলীর, চান মিয়া ও তাঁর ছেলে তারা মিয়া এই তিন জনের ঘানি গাছ রয়েছে। শমসের আলী ছেলে-মেয়েরা ঘানি গাছের জোয়াল টানেন। চাঁন মিয়ার বয়স প্রায় ৬৫ বছর, তাঁর স্ত্রী ফিরোজা বেগমের বয়স ৫৮ বছর।

এক সময় তাঁরা ঘানি ভাঙ্গা ৬ থেকে ৭ কেজি তেল উৎপাদন করতে পারতেন। বয়সের কারনে আগের মতো শরীরের শক্তি নেই। হতদরিদ্র স্বামী স্ত্রী এখন মাঝে মধ্যে নিজেরাই ঘাড়ে জোয়াল নিয়ে ঘানি টানেন। ১ থেকে ২ কেজি তেল উৎপাদন করতে পারলে বাজারে নিয়ে বিক্রি করে কোন রকম সংসার চালায়। বয়সের ভারে মাঝে মধ্যে শরীর ভাল থাকে না। সে সময়টা দরিদ্র সন্তানের দিকে তাকিয়ে থাকতে হয় এক মুঠো ভাতের জন্য।

সরেজমিনে কড়ইতলা গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, গ্রামের ভিতরে এক সাথে দুটি বাড়ি। বাড়ি দুটিতে তিনটি ঘানি গাছ রয়েছে। দুটিতে তেল উৎপাদন হচ্ছে। তারা মিয়ার ঘানি গাছ বন্ধ রয়েছে। কমলা বেগমের স্বামী তারা মিয়া খুপড়ি একটি ঘরের বারান্দায় বসে তেল মেপে দিচ্ছেন মামুন রানা নামের এক যুবককে। মামুন রানার ‘ফেরিওয়ালা’ নামে অনলাইনে একটি ব্যবসা সাইট রয়েছে। ঘানি ভাঙ্গা খাটি সরিষার তেল সংগ্রহ করে তিনি অনলাইনে বিক্রি

করেন। পাশের একটি ছোট্ট ভাঙ্গা ঘরে ঘানি টানছেন কমলা বেগম (৪৬) ও তাঁর মেয়ে কাকলি বেগম (২২)। ঘানির ডালার ভিতরে দেশী ৪ কেজি সরিষা দিয়ে প্রায় দুই ঘন্টা যাবৎ ঘানি টেনে ১২০০ গ্রাম পরিমান তেল উৎপাদন করেছেন। খৈল হয়েছে প্রায় তিন কেজি। দেশী সরিষার দাম এখন বেশি হওয়ায় প্রতি কেজি তেল বিক্রি করেন ২৩০ থেকে ২৫০ টাকা। আর খৈল বিক্রি করেন ৬০ টাকা কেজি দরে। ফোঁটায় ফোঁটায় চুইয়ে ১২০০ গ্রাম তেল

উৎপাদন করতে গিয়ে ঘাড়ে জোয়াল নিয়ে মা-মেয়েকে হাটতে হয়েছে অন্তত ৭ থেকে ৮ কিলোমিটার। প্রতিদিন তেল বিক্রি করে যা আয় হয় তাই দিয়ে তাঁদের সংসার চলে। ভাগ্যবদলের আশায় স্বামীর পূর্ব পরুষদের এ পেশা কমলা বেগম বিয়ের পর বেছে নিলেও অভাব পিছু ছাড়েনি তাঁদের। সকাল ৬ টা থেকে ১০ টা, বিকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ঘানি টানেন। প্রতিদিন ৮ থেকে ১২ কেজি সরিষা ভাঙ্গতে পারেন। কড়ইতলা গ্রামের আবুল হোসেন বলেন, এক সময় এ গ্রামে অনেক গাছ ছিল (ঘানি গাছ) এখন নেই বললেই চলে, বর্তমানে দুটি বাড়িতে রয়েছে। কমলা বেগমের পরিবার অভাবগ্রস্থ, গরু কেনার সামর্থ নেই। ঘাড়ে জোয়াল নিয়ে স্বামী,স্ত্রী ও মেয়ে হাড় ভাঙ্গা পরিশ্রম করেন। কমালা বেগম

জানান, টাকার অভাবে গরু কিনতে পারি না, মা-মেয়ে ও স্বামীকে নিয়ে বুকে ডেঙ্গা বাধিয়ে জোয়াল টানি, একদিন জোয়াল টানতে না পারলে খাব কি? বয়স হচ্ছে আগের মতো পারি না, দুটি না হলেও একটি গরু থাকলেও এমন হাঁড়ভাঙ্গা পরিশ্রম মা-মেয়ের করতে হত না। মাঝে মধ্যে বৃদ্ধ শ্বশুর-শ্বাশুড়ি ঘানি টেনে সহযোগীতা করেন। তারা মিয়া বলেন, আগের মতো দেশী সরিষা পাওয়া যায় না, গ্রামে ঘুরে ঘুরে সরিষা সংগ্রহ করি, তারপরও দাম বেশি। বাপ দাদার সাথে জোয়াল (ঘানি) টানতে টানতে অন্য কোন পেশা শিখতে পারিনি। প্রায় চার যুগ ধরে নিজে জোয়াল টানছি। এখন আর শরীর চায় না, স্ত্রীর সাথে মেয়ে কাকলি জোয়াল টানে। একটি গরু থাকলে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত বংশপরম্পরায় পেশাটি ধরে রাখতে পারতাম।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
Close