খেলাধুলা

আর্থিক দিক থেকে আমার পরিবারকে অনেক কষ্ট করতে হয়েছে-: মার্টিনেজ

একসময় তো হারিয়েই যেতে বসেছিলেন মার্টিনেজ। সেখান থেকে ফিরে এসেছেন, আলো ছড়িয়ে মুগ্ধ করে যাচ্ছেন সবাইকে। কোপা আমেরিকার সেমিফাইনালে কলম্বিয়ার বিপক্ষে টাইব্রেকারে তিনটি শট ঠেকিয়ে রাতারাতি তারকা

বনে যাওয়া এই গোলরক্ষকের জীবনে প্রতিটি অর্জনই এসেছে অসংখ্য ত্যাগ-তিতিক্ষার বিনিময়ে। মার্টিনেজের ফিরে আসার শুরুটা হয়েছিল গত আগস্টে। ২০১৯-২০ মৌসুমের এফএ কাপ ফাইনালে চেলসিকে হারিয়ে শিরোপা জিতে উদযাপনে ব্যস্ত ছিলেন

আর্সেনালের খেলোয়াড়রা। সে সময় একজনকে দেখা গেল একটু দূরে। খেয়াল করে দেখা যায়, বিজ্ঞাপনের বিলবোর্ডের সামনে কানে হেডফোন দিয়ে কথা বলার সময় তার চোখ ছলছল করছে। অশ্রুচোখের সেই খেলোয়াড়টি ছিলেন মার্টিনেজ। দীর্ঘ আট বছর অপেক্ষার পর প্রিয় ক্লাবের হয়ে মাঠে থেকে শিরোপার স্বাদ

পাওয়ার আবেগ ধরে রাখাটা এই গোলরক্ষকের জন্য কঠিনই ছিল। ২০১০ সালে মার্টিনেজকে আর্সেনালে নিয়ে এসেছিলেন তৎকালীন কোচ আর্সেন ওয়েঙ্গার। প্রতিভা চেনার ক্ষেত্রে বলা হয় এই কিংবদন্তির পাকা জহুরির চোখ আছে। আর্জেন্টাইন তরুণ গোলরক্ষকের মাঝে বড় তারকা হওয়ার সম্ভাবনা তিনিই প্রথম

দেখেছিলেন। মার্টিনেজকে ক্লাবের ভবিষ্যৎ বলেই মনে করতেন ওয়েঙ্গার। ধৈর্য ধরে সুযোগের অপেক্ষায় থাকার জন্য উপদেশ দিতেন। গুরুর কথা রেখেছিলেন মার্টিনেজ। দুই বছর পর মূল দলে অভিষেক হলেও কখনো জায়গা পাকা করতে পারেননি। পরের আট বছরে আর্সেনাল তাকে ছয়টি ক্লাবে ধারে পাঠিয়েছে। অবশেষে গত বছর স্থায়ীভাবে যোগ দেন অ্যাস্টন ভিলায়। অথচ এই

আর্সেনালে যোগ দেওয়ার জন্যই মার্টিনেজ উপেক্ষা করেছিলেন মায়ের কান্না, চোখের জল। যদিও সেখানে তাদের অর্থনৈতিক অবস্থাও ভূমিকা রেখেছিল। অভাব অনটনের সংসারে তার বাবাকে প্রতিদিনের খাবার যোগাতেই হিমশিম খেতে হতো। পরিবারের অবস্থা এতই খারাপ ছিল যে ছেলেকে গ্লাভস কিনে দেওয়ার সামর্থ্যও ছিল না মার্টিনেজের বাবার। তাই আবেগ ঝেড়ে ফেলে তাকে নিতে

হয়েছিল কঠিন সিদ্ধান্ত। গার্ডিয়ানকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জীবনের সেই সময়ের কথা জানিয়েছেন এই গোলরক্ষক। মার্টিনেজ বলেন, আর্থিক দিক থেকে আমার পরিবারকে অনেক কষ্ট করতে হয়েছে। আর্সেনালের পক্ষ থেকে প্রস্তাব পাওয়ার পর আমার মা আর ভাই কাঁদতে কাঁদতে বলছিল, ‘আমাদের ছেড়ে যেও না।’ মা-ভাইয়ের কান্না উপেক্ষা করার কারণ ছিল মার্টিনেজের বাবা।

তিনি বলেন, আমি মাঝরাতে বাবাকেও কাঁদতে দেখেছি, তবে সেটা অন্য কারণে। কারণ তিনি টাকা পরিশোধ করতে পারছিলেন না। অভাবের সংসারে তাই আমাকে সাহসী হতে হয়েছিল। ফলে আর্সেনালের প্রস্তাবে সম্মত হই। অনেকেই হয়তো খেয়াল করেছেন, মার্টিনেজের জার্সি নম্বর ২৩। এর পেছনেও আছে তার ত্যাগের

গল্প। শৈশবের কঠিন সময়ের পর আর্সেনালে ব্রাত্য হয়ে থাকাটা মার্টিনেজের ভেতর নিজেকে প্রমাণের তাড়না দিয়েছে বাড়িয়ে। তাই জন্মদিনে ছেলের কাছে না থাকার সিদ্ধান্ত কঠিন হলেও অসম্ভব হয়নি তার কাছে।
এতক্ষণে হয়তো জার্সি নাম্বারের গল্পটা বুঝে গেছেন। ছেলের জন্মদিনের সময় কোপা আমেরিকায় দলের সঙ্গে থাকায় তিন

বছরের ছেলের জন্মদিন উদযাপন করতে পারেননি মার্টিনেজ। কিন্তু প্রিয় সন্তানকে তিনি ধারন করেছেন ভিন্নভাবে, জার্সি নম্বরের মাধ্যমেই! মার্টিনেজের ভাই আলেসান্দ্রো এ বিষয়ে বলেন, ওর ছেলের জন্মদিন ছিল জুনের ২৩ তারিখ। তাই সে ২৩ নম্বর জার্সি পরে খেলছে। তাকে ১২ নম্বর দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সে এটা চেয়ে নিয়েছে। সে বাচ্চাকে খুব ভালোবাসে, সব জায়গায় নিয়ে যায়। তিন বছর বয়সেই সে দুর্দান্ত খেলে। সে বাঁহাতি, যা

চমৎকার। আর্সেনালে যোগ দেওয়ার আগে মার্টিনেজ তার বাবাকে কথা দিয়েছিলেন, লন্ডনের ক্লাবটির সেরা গোলরক্ষক হবেন তিনি। অবশ্য সেটা শেষ পর্যন্ত হয়নি। তবে জীবন তাকে সুযোগ করে দিয়েছে অন্যভাবে। বলা যায় আরেকটু বড়ভাবে, দেশকে প্রতিনিধিত্ব করার মাধ্যমে। কিছুদিন আগেও আর্জেন্টিনার দ্বিতীয় পছন্দের গোলরক্ষক ছিলেন মার্টিনেজ। প্রধান গোলরক্ষক ফ্রাঙ্কো আরমানি করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ায় মূল একাদশে সুযোগ পান তিনি। সুযোগটা কাজে লাগাতে ভুল করেননি। পোস্টের নিচে উজাড় করে দিয়ে ধীরে ধীরে জায়গাটা নিজের করে নিচ্ছেন তিনি।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
Close