তথ্য ও প্রযুক্তি

বি-২ স্পিরিট: বিশ্বের সবচেয়ে দামি সামরিক বিমান

১৯৯৯ সালের ঘটনা, ইউরোপে চলছে চতুর্থ যুগোশ্লাভিয়া যুদ্ধ বা কসোভো যুদ্ধ। বসনিয়ার মতো মুসলিম গণহত্যা এড়াতে সার্বিয়ার উপর হামলা শুরু করেছে বিশ্বের বৃহত্তম সামরিক জোট ন্যাটো। যুক্তরাষ্ট্র থেকে উড়াল দিয়ে

আটলান্টিক মহাসাগর হয়ে নন-স্টপ ফ্লাইটে প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার মাইল দূরত্ব পাড়ি দিয়ে সার্বিয়ায় এসে হামলা শুরু করল ছয়টি বিশেষ ধরনের বোমারু বিমান। ইউরোপিয়ান দেশটির এয়ার ডিফেন্স ব্রিগেডের জেনারেলদের তখন মাথায় হাত। ঘনিষ্ঠ মিত্র

রাশিয়া সতর্ক করে দেয়ার পর ন্যাটোর আকস্মিক বিমান হামলা থেকে বাঁচতে সমস্ত বিমান বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র ও রাডার প্রস্তুত করে তারা বসে ছিল। কিন্তু বিমান হামলা শুরু হওয়ার পর দেখা গেল সেগুলো কোনো কাজেই আসছে না। শত্রুর অজানা অদ্ভুত বোমারু বিমানগুলোকে মিসাইল মেরে ভূপাতিত করা তো দূরের কথা, রাডারেই দেখা যাচ্ছে না!

রাজধানী বেলগ্রেড ও আশেপাশের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনায় কয়েক মিনিটের তান্ডবে ব্যাপক ধ্বংসলীলা চালিয়ে বিমানগুলো ফিরে গেল সাড়ে পাঁচ হাজার মাইল দূরের নিজেদের ঘাঁটিতে! বিশাল এই দূরত্ব পাড়ি দিতে টানা ৩০ ঘন্টা আকাশে উড়েছিল বিমানগুলো। হয়তো ভাবছেন, এত দূরে গিয়ে হামলা করে ফিরে আসার মতো এমন অত্যাধুনিক বিমান পৃথিবীতে আছে নাকি? আজকে আপনাদের শোনান হবে বিশ্বের সবচেয়ে দামি বিমান বি-২ স্পিরিট (B-2 Spirit) এর গল্প। যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি এই লংরেঞ্জ বোমারু বিমানকে বলা হয় এভিয়েশন জগতের এক

বিস্ময়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে থেকেই লংরেঞ্জ বোমারু বিমানের চাহিদা ছিল। স্নায়ুযুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র-সোভিয়েত ইউনিয়নসহ অন্য পরাশক্তিগুলো এ ধরনের উন্নত বিমান বানাতে শুরু করে। এরই ধারাবাহিকতায় মার্কিন এয়ারফোর্স গঠন করে ‘গ্লোবাল স্ট্রাইক স্কোয়াড্রন’। অর্থাৎ সারাবিশ্বের যেকোনো প্রান্তে যুক্তরাষ্ট্র থেকে উড়ে গিয়ে বিমান হামলা চালানোর উপযোগী বিমান এই বহরের প্রধান শক্তি। স্নায়ুযুদ্ধের যুগের বিখ্যাত বোমারু বিমান বি-৫২ এর গতি ছিল কম। আবার রাডার ক্রস সেকশন (RCS) ছিল খুবই বেশি যা উন্নত সোভিয়েত রাডারে সহজেই ধরা পড়ে যেত। ফলে স্টেলথ বোম্বারের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে মার্কিন এয়ারফোর্স। সত্তরের দশক থেকেই রাডার ফাঁকি দিতে সক্ষম স্টেলথ যুদ্ধবিমান তৈরির অভিজ্ঞতা নিতে শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র। এ ধরনের বিমান কীভাবে

কাজ করে তা জানতে ‘স্টেলথ বিমান কিভাবে রাডার ফাঁকি দেয়’ শীর্ষক এই লেখাটি পড়ুন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা গবেষণা বিষয়ক প্রতিষ্ঠান Defense Advanced Research Projects Agency বা DARPA বেশিরভাগ সরকারি অ্যাডভান্স টেকনোলজির প্রজেক্টে নেতৃত্ব দিয়ে থাকে। ১৯৭৪ সালে Advanced Technology Bomber (ATB) প্রজেক্টে বিশাল RCS যুক্ত বিমানকে রাডারে অদৃশ্য করে দেয়া যায় সেই প্রজেক্ট পার্টনার হতে বিভিন্ন বিমান নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের কাছে কনসেপ্ট আহ্বান করে। উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক প্রজেক্টগুলো হয় ‘ওপেন টেন্ডার’ভিত্তিক। যে কোম্পানির সমরাস্ত্র সবচেয়ে ভালো এবং উন্নত হবে, সেটাই কিনে নেয় মার্কিন সরকার। ডারপা-র আহ্বানে সাড়া দেয় নর্থরোপ, লকহিড, ম্যাকডোনেল-ডগলাস ইত্যাদি কোম্পানি।
এদের মধ্যে লকহিড বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুতগতির বিমান ‘এসআর-৭১ ব্ল্যাকবার্ড’ নির্মাণের অভিজ্ঞতায় এগিয়ে ছিল। এই বিমান দুটো কিছুটা স্টেলথ হলেও ডারপা-র প্রয়োজনের তুলনায়

যথেষ্ট নয়। লকহিড পরবর্তীতে ‘এফ-১১৭ নাইটহক’ রিকনসিস বিমান তৈরি করে। এটি বিশ্বের প্রথম কার্যকর স্টেলথ বিমান। তবে একে বানানো হয়েছিল গোয়েন্দা মিশনের জন্য (কসোভো যুদ্ধে এটি ভূপাতিত হওয়ার চমকপ্রদ কাহিনী পড়ুন Roar বাংলায়)। তবে নাইটহকের স্বল্পমাত্রায় আক্রমণ সক্ষমতায় প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় পুরোপুরি সন্তুষ্ট ছিল না। এরই ধারাবাহিকতায় নর্থরোপ কোম্পানি ‘এরিয়া ৫১’-এ ১৯৭৯ সালে খুবই ক্লাসিফাইড একটি বিমানের পরীক্ষা চালায়। এটিই ছিল বি-২ স্টেলথ বোম্বারের ফ্লাইং কনসেপ্ট। পরে ১৯৮৭ সালে প্রোটোটাইপ বানানো ও ১৯৮৯ সালে প্রথমবারের মতো উড্ডয়ন করে বি-২। তখন পর্যন্ত কয়েক দফা ডিজাইন পরিবর্তন ও বিভিন্ন আপডেটের কারণে ২৩ বিলিয়ন ডলার এই প্রজেক্টে খরচ হয়ে গেছে। তবে খরচের মাত্রা তো কেবল শুরু। বি-২ এর খরচের মাত্রা দেখলে আপনার চোখ কপালে উঠে যাবে। ১৯৯৭ সালের হিসেবে প্রতিটি বিমান বানানোর পেছনে নির্মাণব্যয় ৭৩৭ মিলিয়ন ডলার। এটিই বিমানটির প্রকৃত দাম। তবে স্পেয়ার পার্টস ও ইকুইপমেন্ট মিলিয়ে ইউএস

এয়ারফোর্স প্রতিটি বিমান ৯২৯ মিলিয়ন ডলারে কিনেছিল। প্রতিবার মিশন থেকে ফিরে আসার পর বি-২ কে আবার ফ্লাইটের জন্য প্রস্তুত করতে প্রায় ১১৯ ঘন্টা সময় লাগে। এত সময় লাগার কারণ হচ্ছে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও স্টেলথ কোটিং করা যা স্টেলথ বিমানের পূর্বের আর্টিকেলে বিস্তারিত উল্লেখ করা হয়েছে।
মার্কিন এয়ারফোর্সের ইচ্ছা ছিল এটিবি প্রোগ্রামের ১৩২টি বিমান বানানো হবে। কিন্তু এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান শত্রু সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন ঘটেছে। অন্যদিকে বিমানটির প্রোগ্রাম খরচ মাত্রাতিরিক্তভাবে বেড়েই চলছিল। এ কারণে সংখ্যাটি মাত্র বিশে নেমে আসে। পরবর্তীতে প্রথম প্রোটোটাইপকে আরো ৫০০ মিলিয়ন খরচ করে অপারেশনাল এয়ারক্রাফটে রূপান্তর করা হয়। অর্থাৎ মোট ২১টি বিমান সার্ভিসে আনে যুক্তরাষ্ট্র। এর মধ্যে আবহাওয়া বিষয়ক সফটওয়্যারের ত্রুটির কারণে একটি ক্রাশ করে ২০০৮ সালে। প্রতিটি বিমান ওড়াতে ঘন্টাপ্রতি গড় খরচ হয় ১.৩৫ লাখ ডলার। একে সম্পূর্ণ এয়ার কন্ডিশন হ্যাঙ্গার রুমে রাখতে হয় যার খরচ প্রায় ৫ মিলিয়ন ডলার। এর বাইরে শুধুমাত্র রক্ষণাবেক্ষণ

করতেই প্রতিটি বিমানের ক্ষেত্রে বছরে ৩.৪ মিলিয়ন ডলার প্রয়োজন। এসব কারণে রিসার্চ এন্ড ডেভেলপমেন্ট খরচ, আপগ্রেড খরচ মিলিয়ে প্রতিটি বি-২ এর পিছনে এখন পর্যন্ত ২.২ বিলিয়ন ডলার খরচ হয়েছে! এজন্য সামরিক-বেসামরিক মিলিয়ে বি-২ কে বিশ্বের সবচেয়ে দামী বিমানের তকমা দেয়া হয়। তাহলে চলুন জেনে নেয়া যাক বি-২ এর সক্ষমতা। বি-২ স্পিরিট একটি লংরেঞ্জ স্ট্র্যাটেজিক বোম্বার। একে বানানো হয়েছিল শত্রুদেশের খুবই ভেতরে ঢুকে নিখুঁতভাবে বোমা হামলা চালিয়ে সর্বোচ্চ পরিমাণে ক্ষয়ক্ষতি করার জন্য। বিমানটি চালাতে দুজন পাইলট প্রয়োজন। দীর্ঘ সময় আকাশে উড়তে হয় বিধায় এতে বেশ কিছু ইউনিক ফিচার রয়েছে। যেমন- পাইলটদের প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেয়ার জন্য টয়লেট রয়েছে। এছাড়া খাবার গরম করার জন্য মিনি কিচেন রয়েছে। অটো পাইলট সিস্টেম থাকায় একজন ককপিটে বসে থেকে আরেকজন পেছনের করিডোরে প্রয়োজনে ঘুমাতে পারে! তবে মাঝ আকাশে তেল নেয়ার সময় দুজনকেই ককপিটে থাকতে হয়। বিমানটির স্টেলথ সুবিধার কারণে রাডারকে ফাঁকি দিয়ে শত্রু এলাকার অনেক ভেতরে ঢুকে হামলা চালাতে পারে।

এটি ৫০ হাজার ফুট (১৫ কি.মি.) উচ্চতা দিয়ে উড়তে সক্ষম যা শনাক্ত করা রাডারের পক্ষে আরো কঠিন করে তোলে। বি-২ তার দুটি অভ্যন্তরীণ ফুয়েল ট্যাংকে ৭৫,৭৫০ লিটার জ্বালানি নিয়ে সর্বোচ্চ ১,০১০ কি.মি./ঘন্টা গতিতে একটানা ১১ হাজার কিলোমিটার (৬,৯০০ মাইল) দূরে গিয়ে অপারেশন চালাতে সক্ষম। তবে মাঝ আকাশে ট্যাংকার বিমান থেকে একবার ফুয়েল নিলে রেঞ্জ বৃদ্ধি পেয়ে ১৯ হাজার কিলোমিটার হবে। ফলে একাধিকবার ফুয়েল নিয়ে সারা পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে গিয়ে হামলা চালিয়ে আবার যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে আসা সম্ভব। এজন্য বি-২ স্পিরিটকে সন্দেহাতীতভাবে বিশ্বের সেরা বোমারু বিমান বলা যায়। এর সমকক্ষ কোনো বিমান অন্য কোনো দেশের কাছে নেই। তবে সম্প্রতি চীন এর কপি ভার্সন তৈরি করেছে। এর আগে সোভিয়েত ইউনিয়ন বেশ কয়েকবার বিমানটি সম্পর্কে তথ্য চুরি করতে গিয়ে ব্যর্থ হয়।   এটি ১৮-২৩ টনের বিভিন্ন ধরনের বোমা বহন করতে সক্ষম। বি-২ স্পিরিটের দুটি ইন্টারনাল ওয়েপন বে রয়েছে। স্টেলথ সক্ষমতা রাখতে বিমানটি ডানার বদলে পেটের ভেতর তার অস্ত্রশস্ত্র লুকিয়ে রাখে। এটি ৫০০ পাউন্ড ওজনের Mk-82 এবং GBU-38 নামক মোট ৮০টি বোমা বহন করতে পারে। অথবা ভিন্ন কনফিগারেশনে ৩৬টি ৭৫০ পাউন্ড ওজনের CBU ক্লাস বোমা বহন করতে পারে। আরো শক্তিশালী বোমা চাইলে ২,০০০ পাউন্ডের Mk-84 বা GBU-31 বোমা মোট ১৬টি বহন করা যায়। এসবই মূলত বি-২ এর প্রধান অস্ত্র। আনগাইডেড বোমাগুলোকে উন্নত করতে লেজার গাইডেড সিস্টেম এসেছিল যা খুবই নিখুঁত হলেও দিনে-রাতে সব ধরনের আবহাওয়ায় কাজ করত না। পরবর্তীতে

মার্কিন নৌ ও বিমানবাহিনী মিলে Joint Direct Attack Munition (JDAM) নামক ২৫ হাজার ডলার মূল্যের জিপিএস গাইডেন্স কিট বানায়। এটি উপরিউক্ত ৫০০-২,০০০ পাউন্ডের আনগাইডেড বোমাগুলোকে মিসাইলের মতো নিখুঁত স্মার্টবোমায় পরিণত করতে পারে। ট্রেনিংয়ে দেখা গেছে, JDAM বোমাগুলো যদি টার্গেট মিস করে তবে তার জিপিএস কো-অর্ডিনেটের বড়জোর মাত্র ৭ মিটার আশেপাশে পড়েছে! এ কারণে খেয়াল দেখবেন যে চলমান বিভিন্ন যুদ্ধে বেশিরভাগ মার্কিন বিমান হামলাগুলো খুবই নিখুঁত হয়ে থাকে। কিন্তু কখনো কখনো শত্রুর সুরক্ষিত বাংকার মাটির বেশ গভীরে থাকে যা ২,০০০ পাউন্ডের বোমা ফেলেও ধ্বংস করা সম্ভব নয়। এজন্য বি-২ স্পিরিট ম্যাসিভ অর্ডিন্যান্স পেনিট্রেটর (MoP) নামের মোট দুটি GBU-57 নামক বিশেষ বোমা বহন করে যার ওজন ৩০,০০০ পাউন্ড! বাংকার ব্লাস্টার শ্রেণীর এই বোমাতে ৫,৩০০ পাউন্ড বিস্ফোরক ব্যবহার করা হয় যা মাটির ২০০ ফুট নিচে থাকা কংক্রিটের বাংকারকে সম্পূর্ণ গুঁড়িয়ে দিতে সক্ষম! ভিডিওতে এর সক্ষমতা দেখুন। 

এবার মিসাইলের কথায় আসাযাক। বি-২ বোম্বারটি মোট ৩৬টি AGM-154 নামক স্যান্ডঅফ মিসাইল বহন করতে পারে যার রেঞ্জ ২২-১৩০ কি.মি.। আরো দূর থেকে হামলার জন্য রয়েছে AGM-158 নামক এয়ার টু সারফেস ক্রুজ মিসাইল যার রেঞ্জ ৩৭০-৯২৫ কি.মি.! এ ধরনের মিসাইলও মোট ১৬টি বহন করতে পারে। ফলে বহু দূর থেকেও শত্রুর উপর আঘাত হানার সক্ষমতা রয়েছে বি-২ এর। এগুলো তো গেল কনভেশনাল ওয়ারহেডের হিসাব। নিউক্লিয়ার অস্ত্র হিসেবে এই বিমান মোট ১৬টি B-61 বা B-83 নিউক্লিয়ার বোমা বহন করতে পারে। প্রতিটি বি-৬১ বোমার ধ্বংস ক্ষমতা ০.৩ থেকে ৪০০ কিলোটন এবং বি-৮৩ এর ধ্বংস ক্ষমতা ১.২ মেগাটন! অর্থাৎ বুঝতেই পারছেন যে একটি শহর সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেয়ার ক্ষমতা রয়েছে একটিমাত্র বি-২ স্পিরিট বোমারু বিমানের। তবে এর দুর্বলতা শুনে আপনার নির্ঘাত হাসি পাবে। এটি ঝড়বৃষ্টির সময় স্টেলথ মুড বজায় রাখতে পারে না। এছাড়া বজ্রপাতে বিমানটির স্পর্শকাতর প্রযুক্তির ক্ষতি হওয়ার সম্ভবনা আছে (যেটি সাধারণ বিমানে তেমন প্রভাব নেই)। এজন্য বি-২ পাইলটদের ঝড়ো বাতাস ও বজ্রপাত অঞ্চল থেকে সবসময় ৬৪ কি.মি. দূরে থাকার নির্দেশ রয়েছে। তারা স্যাটেলাইট কানেক্টেড ওয়েদার আপডেট অনুযায়ী বিমান চালিয়ে থাকে। বি-২ এর ককপিট খুবই গোপনীয় এবং স্পর্শকাতর প্রযুক্তিতে ভরপুর। ২০১৯ সালে প্রথমবারের মতো এর ভিডিও প্রকাশ করে যুক্তরাষ্ট্র।

১৯৯৯ সালে প্রথমবারের মতো বি-২ স্টেলথ বোম্বার যুদ্ধের ময়দানে ব্যবহার হয়। কসোভো যুদ্ধের সময় সার্বিয়ার বিরুদ্ধে মার্কিন নেতৃত্বাধীন ন্যাটো কোয়ালিশন ফোর্স দেশটির শক্তিশালী আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে গুঁড়িয়ে দিতে যুক্তরাষ্ট্র তাদের তুরুপের তাস বি-২ ব্যবহার করে। দেশটির হাতে সোভিয়েত ইউনিয়নের তৈরি তৎকালীন সময়ের অত্যাধুনিক S-300, S-200, S-125 সহ আরো কয়েক ধরনের এন্টি এয়ারক্রাফট মিসাইল ও উন্নত রাডার ব্যবস্থা ছিল যা সাধারণ যেকোনো বিমানের হামলার জবাব দিতে সক্ষম। কিন্তু বি-২ তো আর সাধারণ কোনো বোমারু বিমান নয়। যুক্তরাষ্ট্র থেকে ৬টি বি-২ বোম্বার প্রায় সাড়ে ৫ হাজার মাইল উড়ে গিয়ে সার্বিয়াতে গুরুত্বপূর্ণ টার্গেটে বিনা বাধায় হামলা চালিয়ে পুনরায় যুক্তরাষ্ট্রে হোম বেজে ফেরত এসেছিল, যার কথা শুরুতেই বলা হয়েছে। এই মিশন সম্পন্ন করতে ৩০ ঘন্টার মতো আকাশে থাকতে হয়েছিল বিমানগুলোকে! এই যুদ্ধে সার্বিয়াতে কয়েক হাজার টন বোমা ফেলে ন্যাটো। এসব বোমার মোট ১১% ফেলেছিল বি-২ বোম্বারগুলো। ৮ সপ্তাহে মাত্র ৫০ বার আকাশে উড়ে সার্বিয়ার ৩৩% হাই ভ্যালু বোম্বিং টার্গেটগুলো (মিলিটারি বেজ, মিসাইল ডিফেন্স সাইট, বিমানঘাঁটি, আন্ডারগ্রাউন্ড বাংকার) বি-২ বোম্বার একাই ধ্বংস করে। একে মিসাইল মেরে ভূপাতিত করা তো দূরের কথা, সার্বিয়ার সমস্ত রাডার সিস্টেম স্টেলথগুলোকে শনাক্ত করতেই ব্যর্থ হয়। তবে ৭ মে, ১৯৯৯ সালে যুক্তরাষ্ট্র ভুল করে সার্বিয়ার চীনের দূতাবাসে বি-২ থেকে পাঁচটি JDAM বোমা ফেলে! অন্য দেশের দূতাবাসে হামলা করা যুদ্ধ

ঘোষণার শামিল। এতে ১১ জন চীনা কূটনীতিক ও স্টাফ নিহত হন। মূলত চীনের দূতাবাসের পাশেই ছিল রাশিয়ান দূতাবাস কমপ্লেক্স ভবন, যেখানে গোপন মিটিং করছিল কয়েকজন সার্বিয়ান জেনারেল। তাদের উপর হামলা করতে গিয়েই এত বড় ভুল হয়ে যায়। পরে অবশ্য যুক্তরাষ্ট্র চীনের কাছে ক্ষমা চায়। নিহতদের পরিবারকে পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ দিয়ে সম্পর্ক স্বাভাবিক করে।
বি-২ বোমারু বিমানটি এখন পর্যন্ত ইরাক, আফগানিস্তান ও লিবিয়ায় ব্যবহৃত হয়েছে। ইরাকের অন্যায় যুদ্ধে বি-২ কর্তৃক শুধুমাত্র ২০০৩ সালেই ৬৪০ টন বোমা ফেলার পরিসংখ্যান পাওয়া যায়। ২০১১ সালে অপারেশন ওডিসি ডাউনে একটি লিবিয়ান বিমানঘাঁটিতে চল্লিশটি JDAM ফেলে মাটির সাথে মিশিয়ে দেয় বি-২। আল কায়দা নেতা ওসামা বিন লাদেন হত্যায় প্রথমে ৩২টি JDAM অথবা একটি MoP বাংকার ব্লাস্টার বোমা ফেলার পরিকল্পনা করা হয়। কিন্তু নিরীহ পাকিস্তানি বেসামরিক লোকজন মারা যাওয়ার আশঙ্কায় সেটি বাতিল করে দেয়া হয়। ২০১৭ সালে দুটি বি-২ বোমারু বিমান ৩৪ ঘন্টার এই ফ্লাইটে যুক্তরাষ্ট্র থেকে লিবিয়ায় উড়ে গিয়ে আইএস জঙ্গিদের ট্রেনিং ক্যাম্পে হামলা করে ফিরে আসে। ব্যাপক খরুচে এই অপারেশন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনা ও হাস্যরসের জন্ম দেয়। কেননা জঙ্গিদের তাঁবু, মাটির বাংকারের উপর ১০৮টি ৫০০ পাউন্ডের JDAM ফেলা হয়েছিল। টানা ৩৪ ঘন্টা ফ্লাইটের কথা শুনে পাঠক হয়তো ভাবছেন যে একটি বিমান একটানা কতক্ষণ আকাশে উড়তে পারে? কতক্ষণ একটানা ইঞ্জিন চালু থাকতে পারে? তাহলে আপনাকে জানিয়ে দেয়া যাক আরেকটি চমকপ্রদ তথ্য। আফগানিস্তানে অপারেশন এনডিউরিং ফ্রিডমের সময় তালেবান নিয়ন্ত্রিত এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম গুঁড়িয়ে দিতে আবারও বি-২ বোম্বার ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির মিসৌরি অঙ্গরাজ্যের হোয়াইটম্যান এয়ারবেজ হচ্ছে এই বিমানের মূল ঘাঁটি। এখান থেকে সরাসরি উড়ে গিয়ে আফগানিস্তানে হামলার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এজন্য মাঝ আকাশে কয়েকবার রিফুয়েলিং করা হবে। আর

তেলবাহী এসব ট্যাংকার বিমান আসবে প্যাসিফিক অঞ্চলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বিভিন্ন মার্কিন বিমানঘাঁটি থেকে। কিন্তু ফ্লাইট প্যাথ বিশ্লেষণ করে দেখা গেল যে বিমানগুলোকে কিছু সময়ের জন্য রাশিয়ার নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলের আকাশসীমা ব্যবহার করতে হবে।
প্রতিদ্বন্দ্বী দেশের সবচেয়ে সেরা বোমারু বিমান সামরিক অপারেশনে আপনার দেশের আকাশসীমা ব্যবহার করবে- এমনটি আসলে মেনে নেয়া যায় না। স্বাভাবিকভাবেই রাশিয়ার উপর দিয়ে উড়ে যাওয়ার অনুমতি পায়নি মার্কিন এয়ারফোর্স। বাধ্য হয়ে নতুন ফ্লাইট প্ল্যান সাজানো হয়। সেটি অনুযায়ী বি-২ স্পিরিট প্রশান্ত মহাসাগর পাড়ি দিয়ে ভারত মহাসাগর হয়ে পাকিস্তানের আকাশসীমা ব্যবহার করে আফগানিস্তানে ঢুকে তালেবান সরকার নিয়ন্ত্রিত বিভিন্ন রাডার, মিসাইলঘাঁটির উপর ব্যাপক হামলা করে। মিলিটারি এভিয়েশন ইতিহাসের সবচেয়ে দীর্ঘতম এই ফ্লাইটের ব্যাপ্তি ছিল ৪৪.৩ ঘণ্টা!
এই দীর্ঘসময় বিমানগুলো কোথাও ল্যান্ড করেনি। তবে ৫ বার মাঝ আকাশে ট্যাংকার বিমান থেকে জ্বালানী সংগ্রহ করেছে। বিমানগুলো প্রতি ছয় ঘন্টা পরপর ৪৫,০০০ লিটার জ্বালানি নিয়েছিল। আরও অবাক করা ব্যাপার হলো হামলা শেষে ফেরার পথে ভারত মহাসাগরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি ডিয়েগো গার্সিয়া দ্বীপে ল্যান্ড করলেও সেখানে আগে থেকে থাকা ১৮টি বি-১ ও বি-৫২ বোম্বারের কারণে এই বিমানটি রাখার জায়গা ছিল না। ফলে ইঞ্জিন বন্ধ না করেই পাইলট দুজন নেমে যান। এ সময় আবারও রিফুয়েলিং করা হয়। পরিবর্তন করা হয় বিমানের টয়লেটের ট্যাংক। খাবার ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক সাপ্লাইসহ নতুন দুজন পাইলট

ককপিটে বসেন এবং বিমান নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে ফেরত যান। অর্থাৎ একটানা ৭০ ঘণ্টা বিমানটির ইঞ্জিন চালু ছিল! একবারের জন্যও বন্ধ হয়নি বা কোনো সমস্যা হয়নি। এখানেই বি-২ এর শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণিত। এটি আধুনিক এভিয়েশন ইতিহাসের একটি বিস্ময়। বেসামরিক বিমানের মধ্যে সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্সের এয়ারবাস A350-900ULR বিমানটি টানা ১৮.৩ ঘন্টা ফ্লাইয়ের রেকর্ড আছে। তবে বি-২ এর মতো এত দীর্ঘ সময় আকাশে ওড়ার রেকর্ড আর কোনো সামরিক বিমানের নেই। যুক্তরাষ্ট্র ২০৩২ সালে এই বিমানগুলোকে অবসরে পাঠাবে। এর স্থান দখল করে নর্থরোপের তৈরি বি-২১ রেইডার যার রাডার ফাঁকি দেয়ার সক্ষমতা বি-২ এর চেয়েও বেশি।  চলুন দেখে নেয়া যাক বি-২ এর আরো কিছু চমৎকার ছবি

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Back to top button
Close