খেলাধুলা

‘কোনো কোচই আমাকে নিয়ে কাজ করেনি’- মুস্তাফিজের বিস্ফোরক অভিযোগ!

২০১৫ সালে রূপকথার মতো শুরু হয়েছিল মুস্তাফিজুর রহমানের। এরপর নিজেকে আরও শাণিত করেন ২০১৬ সালে। বিভিন্ন ফরম্যাটে ক্যারিয়ারের প্রথম উইকেটের তালিকা দেখলেও তার দেয়া চমকের একটা ধারণা পাওয়া যায়। টি-টোয়েন্টিতে

শহীদ আফ্রিদি, টেস্টে হাশিম আমলা, ওয়ানডেতে রোহিত শর্মা আর আইপিএলে গিয়েই এবি ডি ভিলিয়ার্স। আর সেবারে আইপিএলেও মুস্তাফিজ ছিলেন নায়ক, ডেভিড ওয়ার্নার তো ভূয়সী প্রশংসায় ভাসিয়েছেন সাতক্ষীরার \’কাটার মাস্টার\’কে। আইপিএল ইতিহাসে একমাত্র অভারতীয় ক্রিকেটার মুস্তাফিজ, যিনি

ইর্মাজিং ক্রিকেটার অফ দ্য সিজন\’ পুরষ্কার পান। কিন্তু তারপরই ছন্দপতন- সমালোচক থেকে বিশ্লেষক সবাই লিখতে আর বলতে থাকলেন মুস্তাফিজ হারিয়ে গেছেন। মুস্তাফিজের ভাষায় অবশ্য পুরো বিষয়টাই ছিল \’ভাগ্যের দোষ\’। মাত্রই আলো ছড়াতে শুরু করেছেন। কিন্তু ক্যারিয়ারের সেই একেবারে গোড়ার দিকে মুস্তাফিজুর রহমান চোট পান বোলারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ, কাঁধে। অনেকেই বলেছিলেন – মুস্তাফিজ আর কখনও ফিরে

আসবেন না। মুস্তাফিজের নিজের অবশ্য কখনও তা মনে হয়নি। কনুইয়ে ব্যথা অনুভব করতেন। তাই তার প্রিয় ডেলিভারি কাটার থ্রো করতে সমস্যাই হচ্ছিল। যেটুকু খারাপ করেছেন তাতে ইনজুরির ভূমিকাই বেশি ছিল বলে মনে করেন তিনি, \’একেবারে খারাপ কিন্তু করিনি। দেখুন, আমি যে বলটা করি সেটা বা-হাতের স্পিন বলা যায়, অফ স্ট্যাম্পের বাইরের দিকে যায়। এমন বল ১২৫ থেকে ১৩৫ কিলোমিটার গতিতে করতে গেলে কাঁধে বাড়তি জোর

লাগে, যা করাটা সার্জারির পর খানিকটা কঠিন হয়ে গিয়েছিল।\’
সার্জারির আগে-পরে মুস্তাফিজের পরিসংখ্যান দেখলেও তার কথার পক্ষে যুক্তি পাওয়া যায়। ২০১৫ সালে মুস্তাফিজ ৭৫ ওভারের মতো বল করে পেয়েছিলেন ২৬টি উইকেট। আর ২০১৭ সালে ৮৩ ওভারে পেয়েছেন ১৪ উইকেট। তবে মুস্তাফিজ বেশ কয়েকবারই চোট থেকে ভালোভাবে ফিরেছেন। ২০১৯ সালে তাকে নিয়ে অনেক সমালোচনা হলেও ২০১৮ সাল তিনি কাটিয়েছেন একজন পেস

বোলারের স্বপ্নের বছরের মতো। সেবার নিদাহাস ট্রফিতে ভারতের বিপক্ষে ফাইনাল জমিয়ে তুলেছিলেন মুস্তাফিজ।  সেবার ভারতের সাথে নিদাহাস ট্রফির ফাইনাল ও এশিয়া কাপের ফাইনালে বাংলাদেশের বেশ হৃদয়বিদারক পরাজয় ঘটেছিল। তবে বাংলাদেশকে যদি কেউ জয়ের কাছাকাছি নিয়ে গিয়ে থাকেন, তিনি সেই মুস্তাফিজই। ২০১৮ সালে মুস্তাফিজুর রহমান প্রায় ১৫০ ওভার বল করে ২৯টি উইকেট নেন। গড় ছিল ২১, ইকোনমি রেট ৪.২০। ওই বছর বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, আমেরিকা, ক্যারিবীয়

দ্বীপপুঞ্জ, দুবাইয়ে খেলে বেড়িয়েছেন। সবখানেই নিজের মেধা আর দক্ষতার ছাপ রাখেন। কিন্তু পরের বছ সেটা আর ধরে রাখতে পারেননি। মুস্তাফিজের ক্যারিয়ারে ২০১৫ সালটা অস্বাভাবিক রকমের ভালো। প্রতি বছর সেই পারফরমেন্সের পুনরাবৃত্তি করা গেলে মুস্তাফিজ হতেন সময়ের সেরা পেস বোলার। কিন্তু চোটের সাথে আরও একটা জিনিস ছিল মুস্তাফিজের অন্তরায়। সেটা হলো, মুস্তাফিজ যে ডেলিভারিতে রোহিত শর্মা, ধোনি, রায়নার মতো খেলোয়াড়কে সাজঘরে ফেরাতেন, সেটা তখন সবার কম্পিউটারে গবেষণার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। ব্যাটসম্যানরা তার কারিকুরি ধরে ফেলেন। সবাই বুঝতে পারেন, অপেক্ষা করে

দেরিতে মারলেই তো মুস্তাফিজ কুপোতাক! মুস্তাফিজের ইকোনমি রেট দেখলেও এটা বোঝা যায় যে তার রহস্য খানিকটা হলেও উন্মোচিত হয়ে পড়েছে। ২০১৬ সালে মুস্তাফিজের আইপিএল ইকোনমি রেট ছিল সাতের নিচে, এখন সেটা সাড়ে আট ছুঁই ছুঁই। জোরের ওপর করা বল যখন লেগ স্ট্যাম্পে পড়ে গতি বদলে অফ স্ট্যাম্পের বাইরের লাইনে যায়, তখন ব্যাটসম্যানরা অনেক সময়ই ব্যাটের গতি সামলাতে পারেন না, বল উঠে যায় মিড অন কিংবা ৩০ গজের বৃত্তের ভেতর কোন ফিল্ডারের হাতে। সহজ ক্যাচ হয়ে ব্যাটসম্যান ফিরে যান প্যাভিলিয়নে। মুস্তাফিজুর রহমানের বোলিং ক্যারিয়ারে এই ধরনের উইকেট \’ট্রেডমার্ক\’ হয়ে আছে।

বাংলাদেশ ক্রিকেট দল যখন নতুন ক্রিকেটার খোঁজা নিয়ে দুশ্চিন্তায় ছিল, তখন মুস্তাফিজুর রহমান এসেছিলেন \’আশার আলো\’ হয়ে। নির্বাচক, অধিনায়ক, টিম ম্যানেজমেন্ট-সহ পুরো ইউনিট হাফ ছেড়ে বাঁচে তাকে পেয়ে। তাদের কাছে, মুস্তাফিজ মানেই খানিকটা নির্ভার হওয়া। কিন্তু দ্রুতই আধুনিক ক্রিকেটের আতসী কাঁচের নিচে পড়ে যাওয়া মুস্তাফিজকে কেউ নতুন পথ দেখাতে পারেননি। বাংলাদেশের যখন একটা সমীহ করার মতো পেস বোলিং ইউনিট তৈরি হয়েছিল, তখন বোলারদের নিয়ে কাজ করতেন জিম্বাবুয়ের সাবেক অধিনায়ক হিথ স্ট্রিক। ওই সময় মাশরাফির নেতৃত্বে রুবেল হোসেন, তাসকিন আহমেদ, মুস্তাফিজেরা বাইশ গজে ঝড় তুলতেন। হিথ স্ট্রিক চলে যাওয়ার পর টাইগারদের বোলিং গুরুর জায়গা নেন ক্যারিবিয়ান

কিংবদন্তি কোর্টনি ওয়ালশ। কিন্তু মুস্তাফিজকে নিয়ে শুরুতে বাড়তি কাজ করার প্রয়োজন হয়নি। প্রয়োজন যখন হয়েছে, তখন আর তাকে নিয়ে আলাদা কাজ করাই হয়নি। মুস্তাফিজের বোলিং তাই অনেকটা পানশে হয়ে যায় একটা সময়। মুস্তাফিজ বলেন, কোনো কোচ তাকে অ্যাকশনে পরিবর্তন বা এ ধরণের কোন পরামর্শ দেয়নি। তার ভাষায়, \’নিজে নিজেই কাজ করেছি। দলের সিনিয়রদের সাথে কথা বলেছি।\’ বিশেষ বোলারদের ক্ষেত্রে যেটা প্রয়োজন, প্রকৃতিপ্রদত্ত গুণের সাথে বাড়তি অস্ত্রের দিকেও নজর দেন কোচরা। কিন্তু মুস্তাফিজের ক্ষেত্রে সেটা হয়নি। অবশেষে নিজের চেষ্টাতেই মুস্তাফিজ নিজেকে ফিরে পান। এবারের

আইপিএলে মুস্তাফিজের জন্য ছিল বিশেষ কিছু। খুব একটা ফর্মে ছিলেন না, তবু ডাক পেয়েছেন। কোটি টাকা মূল্যও পেয়েছেন। কিন্তু পারফর্মেন্স দেখে মনে হচ্ছে, তার দাম আরও অনেক বেশি হওয়া উচিত ছিল। সাত ম্যাচে ৮ উইকেট নিয়েছেন মুস্তাফিজ। যার মধ্যে ম্যাচ জেতানো তার পুরোনো দল সানরাইজার্স হায়দ্রাবাদের বিপক্ষে ২০ রানে তিন উইকেটও ছিল। তার বলে ওঠা ক্যাচগুলো সব ধরলে উইকেট সংখ্যা ১০ ছাড়িয়ে যেত।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
Close